Skip to content
Spread the love

চাকায় পিষ্ট প্রাণ

নূর সালাম খান

দুপুর ১টা। জোহরের আযান হল। তাড়াহুড়ো করে রান্না শেষ করে জোহরের নামাজ পড়লো জোহরা বেগম। দরজার পাশে দাঁড়িয়ে তার স্বামী মোবারকের জন্য অপেক্ষা করছে। প্রতিদিন এভাবেই জোহরের নামাজের পর স্বামীর জন্য অপেক্ষায় থাকে। স্বামী দুপুরে আসে আবার খাবার খেয়ে তাড়াইল চলে যায়। কিন্তু আজকে অনেকক্ষন ধরে অপেক্ষা করতেছে। এখনো আসছেনা কেন? অজানা চিন্তা আর ভয় তাকে তাড়া করছে। ঘরের চৌকাট পেরিয়ে বাহিরে পা চালালো। উঠানের এদিক ওদিক পায়চারী করছে। চিন্তার রেখা দেখা দিল তার কপালে। প্রিয়জনের জন্য অপেক্ষা যে মৃত্যুসম যন্ত্রণা দেয়, তা আজ হাড়ে হাড়ে বুঝতে পারছে জহুরা বেগম। 
 
অপেক্ষার অবসান হল। প্রিয়তম স্বামী মোবারক মিয়া ঘরে ফিরলো। স্বামীর সারা দেহ ঘামে ভিজে চপচপ করছে। পড়িহিত পাতলা টি-শার্ট ভিজে শরীরের সাথে মিশে লেপ্টে গেছে। রোদ পোড়া তামাটে রঙ্গের বুক আর বুকের কুচকুচে কালো পশমগুলো দেখা যাচ্ছে। পশমভরা এ বুকটা জোহরা বেগমের খুব ভাল লাগে। যেন এ বুকটাই তার এ পৃথিবীর জান্নাত। তার খুব ইচ্ছে করে সারাক্ষণ এ বুকটায় শোয়ে থাকতে। এখনো তার ব্যতিক্রম নয়। তার মনের গহীনে এক অন্যরকম অনুভুতি জেগে উঠলো। 
 
জহুরা বেগম স্বামীর বুকপানে তাকিয়ে ঠোঁট টিপে মিটিমিটি হাসছে। হাস্যোজ্বল মুখে স্বামীকে বললো – এই যে হুনুইন, দুফুরের খানা খাইবার লাইগ্যা বাড়িত আইতে অত দেরি অইছিন ক্যারে? ম্যালা রাস্তার খ্যাপ ফাইছিলাইন বুঝি?
 
-আর কইয়োনা বউ, সহালে উইট্টেই কুফাডা লাগছিলো। এক লগে মহিষের মত বড় বড় তিনডে বেডা রিকশায় উঠছিলো। তিনঘন্টা এইহানো হেইহানো ঘুইরে ভাড়া দিছে মাত্র ৫০ ট্যাহা। ন্যায্য ভাড়া চাইতেই কুত্তার মত আচরণ করছে। মানুষরে আল্লায় সৃষ্টির সেরা বানাইছে। মনুষ্যত্ব, বিবেক দিছে বলেই তো এরা মানুষ। কিন্তু এরা বিবেকহীন। এরা মানুষরুপী পশু। এরা নাকি নেতা।
 
-মন খারাপ হরুইন না যে,,আল্লা এদের বিচার হরবো আর আল্লাই আমরারে বাঁচাইবো।  
 
– জানো বউ, রিকশা চালানোর ইচ্ছাডাই আইজ কুরবানী অইয়া গেছে। এই রহম আচরণ ফাইলে কষ্ট লাগেনা, কও? ছোডু শহরে আর রিকশাই চালাইতাম না। রুক্ষ আর কষ্ট মিশ্রিত কণ্ঠে কথাগুলো বলতে থাকে মোবারক মিয়া।
জোহরা বেগম আর কথা বাড়ায় না। জলদি গিয়ে পাটি বিছিয়ে খাবার রেডি করে। জোহরা বেগম হাতপাখা দিয়ে বাতাস করতে থাকে আর মোবারক মিয়া খাবার খেতে থাকে। খেতে খেতে স্ত্রীকে ডেকে বললো – জহুরা! ও জোহরা!  হুনতাছো?
 
-হুম কইন।
 
-চিন্তা করছি ঢাহা যাইয়াম। ছোডু শহরে রিকশা টাইন্যে ফায়দা নাই। এ কথা শোনা মাত্রই জোহরা বেগমের বুকের মধ্যিখানে খচখচানি দিয়ে উঠলো। মনের ভেতর ভীষণ ধাক্কা খাইলো। পাশের বাড়ির মরিয়মের কথা ভেবে সে অস্থিরতায় পড়ে গেল। মরিয়মের স্বামী ঢাকায় রিকশা চালাতে গিয়ে আরেকটা বিয়ে করেছে ফেলেছে। জোহরা বেগমের মনে এমন একটা ভয় ঢুকেছে। 
 
দুপুরের খাবার খেয়ে বিছানায় শোয়ে পড়লো মোবারক মিয়া। স্বামীর পাশে শোয়ে লোমশ বুকে আর মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে বললো -আইনহে কি হাছা হাছা ঢাহা যাওয়ার কথা ভাবতাছুইন?
 
– হ বউ। ভাবছি এ মাসের শ্যাষেই ঢাহা যাইয়াম।
 
স্বামীকে ইনিয়ে বিনিয়ে বুঝাতে থাকে- হুনুইন, এইহানের রোজি রোজগার দিয়াই তো আমরার ভালা চলতাছে। আমি আর কোনুদিন উল্ডাপাল্ডা কিসতা চাইতাম না। আইনহে খুশি অইয়া যেতা আনবাইন হেইতা লইয়াই আমি খুশি তাহাম। একটা নয়া শাড়ি আর একটা মোবাইল আনবার কথা কইছিলাম না? এগুলা কিচ্ছু আনোন লাগতো না। তাও আইনহে ঢাহা যাইননা যে হা,,। কউহাইন ঢাহা যাইতাইন না, আইনহে ছাড়া আমার আপন ক্যাডা আছে? কউহাইন যাইতাইন না বলেই কাঁদো কাঁদো ভাব।
 
হুনো! বহুত ভাইব্যে চিন্তেই কইছি ঢাহা যাইয়াম। তুমি অত্ত কথা কইতাছো ক্যারে,,হা। রেগে যায় মোবারক মিয়া। জোহরা বেগম হালকা ধমকে অবুঝ শিশুর মত চুপ হয়ে যায়। কিন্তু  মনের ভেতরের খচখচানিটা আরো ঘন কালো হয়ে জেগে উঠে। নানান দুশ্চিন্তা আর বুকের খচখচানি নিয়েই দিনের পর দিন পার করছে। 
 
আজ মাসের শেষ দিন। মোবারক মিয়া কাপড় চোপড় ও অন্যান্য কিছু ব্যাগে গুছিয়ে নিল। সাড়ে নয়টায় ট্রেন। 
জোহরা বেগমের মুখে রা নেই। তার অন্তর পুড়ছে। বোবাকান্নায় নেত্রকোণ বেয়ে গরম জল টপটপ ঝরে পড়ছে। স্বামী ছাড়া তো এই দুনিয়ায় তার আপন কেউ নেই। স্বামী চলে গেলে প্রতিরাতে কে তাকে সন্দেশ আর ডেইরী মিল্ক কিনে দেবে? কে তাকে সব কাজে সাহায্য করবে? রান্নার সময় চুপিচুপি ঘরে ঢুকে পিছনে দাঁড়িয়ে দুচোখ চেপে ধরে কে বলবে কও তো আমি ক্যাডা? কে তাকে আদরে সোহাগে মুখে তুলে খাইয়ে দেবে? এসব ভেবে হঠাৎ ডুকরে কেঁদে উঠে জোহরা বেগম। 
 
স্ত্রীর এমন অবুঝ শিশুর মত কান্না দেখে মোবারক মিয়া দৌড়ে এসে ঝাপটি মেরে বুকে জড়িয়ে ধরে। অশ্রু মুছে দেয়। মাথায়, পিটে হাত বুলাতে বুলাতে বলে- লক্ষী সোনা আমার, কাইন্দোনা। মাসে মাসে একবার তো আইয়ামই। হারাজীবন তোমার লগে, তোমার মাঝে তোমার পাশেই তো তাহাম। অত চিন্তা করতাছো ক্যারে?
স্বামীর আদরমাখা কথায় জহুরা বেগমের মায়া আরো দ্বিগুণ বেড়ে যায়। কষ্টের নদী উতলে উঠে। চোখ টলমল করে নোনাজলে। সে জল গাল, নাক গড়িয়ে বুক ভাসায়।
আহা! কাইন্দোনা সোনা ময়না আমার, কাইন্দোনা। আমি কি হারা জিন্দেগীর লাইগ্যে যাইতাছি না-কিতা? উড বউ। লও ইস্টিশনে যাই। 
 
অটো রিকশায় চড়ে দুজন ইস্টিশনে গেল।
ইস্টিশনে যাওয়ার সাথে সাথে ট্রেনে হর্ণ বেজে উঠলো। ট্রেনের হর্ণ আওয়াজটা জহুরা বেগমের বুকে প্রিয়তম স্বামীকে বিদায় দেওয়ার যন্ত্রণা জাগিয়ে দিল। 
মোবারক মিয়া ট্রেনের দিকে দৌড় দিল। কিছুদুর গিয়ে হঠাৎ থমকে দাঁড়াল। বউয়ের অসহায় মায়াময় মুখটার দিকে শেষবার ফিরে তাকালো। মানবমূর্তি রুপে পলকহীন  চোখে তাকিয়ে আছে। 
আবার হর্ণ বেজে উঠলো। এবার ট্রেন চলতে শুরু করলো। মোবারক মিয়া সম্বিত ফিরে পেয়ে দ্রুত দৌড় দিয়ে ট্রেনে উঠলো। ট্রেনের জানালা দিয়েও তাকিয়ে আছে তার ঘরের লক্ষী, মনের লক্ষী বউ জোহরা বেগমের দিকে। এই মুহুর্তে মোবারকের বুকটা ফাঁকা লাগছে। নিজেকে একা লাগছে। অজান্তেই সে হু হু করে কেঁদে উঠে। ট্রেন চলছেই তো চলছে। চলতে চলতে দূরে,,,দূর থেকে বহুদূরে,,,
 
শুরু হল মোবারক মিয়ার ঢাকার জীবন। অবাক হয়ে বিড়বিড় করে বলে, ওরে আল্লা,, কত্ত অলিগলি, কত্ত মানুষ? রিকশার প্যাডেল ঘুরায় আর গুনগুনিয়ে গান গায়। নিজের সাথে নিজেই কথা বলে আর হাসে। আজব শহর ঢাকা। লাল নীল সবুজ কত বাত্তি জ্বলে রে,,,।দিনের বেলায় দিন রাইতের বেলায়ও দিন। সব সময় সব ফকফকা থাকে। যখন তখন খ্যাপ মারা যায়। 
 
তাড়াইলে দৈনিক মাত্র ১৫০-২০০টাকা রোজগার হতো। ঢাকায় এসে ৮০০-১০০০টাকা রোজগার হয়। সত্যিই ঢাকায় টাকা উড়ে। কেউ ধরে, কেউ ছাড়ে। মোবারকের ম্যালা আয়। সে রঙ্গিন  স্বপ্ন দেখে। তার নিজের গাড়ি হবে, বাড়ি হবে, গরু হবে, জমি হবে, বউয়ের জন্য শাড়ি হবে, মোবাইল হবে আরো কত কি? তার মনে সীমাহীন আনন্দ।
মোবারক মিয়া ঢাকা এসেছে আজ এক মাস পুর্ণ হল। বৌয়ের জন্য তার মনটা ছটফট করছে। এদিকে জোহরা বেগমের মনেও ছটফটানি। দিন গুনে আর স্বামী আসার অপেক্ষা করে। আজ দুটি মনেই কাছে আসার ব্যাকুলতা বেড়েছে। মোবারক মিয়া কাল বাড়ি যাবে। গুলিস্থান মার্কেটে গিয়ে বউয়ের জন্য মোবাইল,  লাল শাড়ি, লালফিতে, চুড়ি, আইব্রো, স্নো, সুগন্ধি তেল, সাবান আরো অনেক কিছু কিনে নিল। ছোট চাচীকে মোবাইল করে বললো জোহরাকে দিতে।
-হ্যালো! জোহরা,,,তুমি ভালা আছো সোনা? আমি ভালা আছি। আমি কাইলকে বাড়ি আইতাছি। জানো বউ-তোমার লাইগ্যা ম্যালা জিনিস কিনছি। কি কি কিনেছে সব বললো। 
 
-আমার কিচ্ছু লাগতো না। আইনহে বাড়ি আইলেই আমি খুশি। আইনহেই আমার হাসি, খুশি। আইনহেই আমার সব। অতঃপর নানান কথা শেষে লাইন কেটে দিল। 
জোহরা বেগমের খুশি আর ধরেনা। সকাল সকাল গোসল সেরে সাজুগুজু করে স্বামীর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলো। আজ অনেক সুস্বাদু খাবার রান্না করে রেখেছে  স্বামীর জন্য।
স্বামীকে নিয়ে একসাথে খাবে বলে এখনো খায়নি।
দুপুর গড়িয়ে বিকেল হয়ে গেল। এখনো আসছেনা কেন? অস্থির লাগছে জোহরা বেগমের। মূহুর্তেই মনটা বেজায় খারাপ হয়ে গেল। অকারণে কেন যেন তার চিৎকার করে কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছে। হঠাৎ বাড়ির সামনে অনেক মানুষের হৈ-হুল্লোড়, চিল্লাচিল্লি শুনতে পেল। 
এর মধ্যে আবার তার শ্বাশুড়ির কান্নার আওয়াজ শুনতে পেল। 
ও আল্লাগো। আমার আম্মার কি অইলো গো বলে বাড়ির সামনের দিকে দৌড় দিল। 
শত শত মানুষের ভীড়। লোকজন বলাবলি করছে ট্রাকের সাথে বাসের ধাক্কা লেগে বাস উল্টে ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে। কিন্তু তার শ্বাশুড়ি কাঁদছে কেন? জোহরা বেগমের ভেতরে অসম্ভব এক ভয় নাড়া দিল। পুরো উন্মাদের মত ভীড়ের দিকে এগুচ্ছে। বুক কাঁপছে থরোথর। গলা শুকিয়ে গেছে। প্রচন্ড জোরে ভীড় ঠেলে গোলের ভেতরে গেল। চাদরে ঢাকা একটা নিথর দেহ দেখতে পেল। কি যেন ভেবে কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলো। তার সারা শরীর কাঁপছে। কপাল ছিটকে ঘাম ঝড়ছে। শত শত মানুষ। সবাই নিরব। সবার মুখের দিকে তাকাচ্ছে জোহরা বেগম। তার বুকে হাতুড়িপেটা শুরু হয়েছে। লাশের উপর থেকে চাদর সরাতে সে ভয়ানক ভয় পাচ্ছে। হঠাৎ লাশের পাশে একটা শপিং ব্যাগ দেখতে পেল। ব্যাগটা খুলে দেখলো তার স্বামী যা যা কিনেছিল বলে জানিয়েছিল তা সব এই ব্যাগে। তখন বিদ্যুৎ বেগে এক হেচকা টানে পুরো চাদর লাশের উপর থেকে সরিয়ে নিলো। দেখতে পেল তার স্বামীর ক্ষত বিক্ষত রক্তাক্ত লাশ। 
না,,,। ও আল্লা, আমি এ কি দেখতাছি গো আল্লা। 
ওগো,, আফনি কথা কইন। চুপ থাইক্যেন না। কথা কইন। আইনহে না কইছিলাইন আমার মাঝে, আমার সাথে আমার পাশে হারা জীবন থাকবাইন। আমারে একলা রাইখ্যা যাইয়েন না। 
জোহরা বেগমের বুকে সুনামির বাঁধভাঙ্গা ঢেউ। জীবন থমকে গেল। স্বপ্ন ভেঙ্গে খানখান হয়ে গেল। বুকের ভিতর দাউদাউ আগুন জ্বলছে তার। কিছু কষ্ট এত বিশাল যা সহ্য করা যায়না। কিছু ব্যথা এত অসীম যা বুকে রাখা যায়না। জোহরা বেগমের অবস্থা তাই হল।
 
 বিরামহীন বিলাপ করে যাচ্ছে। আল্লা, তুমি এ কি করলা গো আল্লা? আল্লা,,,তুমি আমারে নিয়া যাও, আমারে নিয়া যাও বলে বুক চাপড়াতে থাকে।হঠাৎ এক চিৎকার দিয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়ে। কোন সাড়া শব্দ নেই। নিরব মরাবাড়ি। কেউ বলছে অচেতন হয়ে গেছে, ঠিক হয়ে যাবে। আবার অন্যকেউ বলছে দাঁতি লাগছে। দাঁতের দু’পাটির ফাঁকে পয়সা দিয়ে ছাপ দিলে ঠিক হয়ে যাবে।
 
আধাঘন্টা ধরে চেষ্টা চলতেছে জহুরা বেগমের চেতনা ফিরাতে। ব্যর্থ সবাই। জরুরী ভিত্তিতে হাসপাতালে নিয়ে গেল। অনেক পরীক্ষা নিরিক্ষার পর ডাক্তার জানালেন তার মৃত্যু হয়েছে।
পুরো গ্রামে শোকের মাতম। লোকজন বলাবলি করছে বেচারি জোহরা খুব স্বামীভক্ত ছিল। স্বামীর বিয়োগ সইতে না পেরে শেষে কলিজা ফেটে মরলো। আহারে!  কষ্ট। 
স্বামী স্ত্রী দুজনকে এক সাথে শেষ গোসল দেওয়া হল। পাশাপাশি কবর দেয়া হল দুজনকে।
 
নূর সালাম খান
সিনিয়র সহ-সভাপতি
তাড়াইল কেন্দ্রীয় প্রেসক্লাব, কিশোরগঞ্জ।