বাংলা সাহিত্যে উইলিয়াম শেক্সপিয়ার ও তার প্রভাব
সোমা ঘোষ মণিকা
বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে এমন কিছু নাম আছে যাদের ছায়া যুগ পেরিয়ে যুগে, মহাদেশ পেরিয়ে মহাদেশে বিস্তার লাভ করেছে। তারা কেবল এক ভাষার, এক ভূখণ্ডের লেখক নন; বরং মানবসভ্যতার চিরন্তন কণ্ঠস্বর হয়ে ওঠেছেন। উইলিয়াম শেক্সপিয়ার সেই রকমই এক উজ্জ্বল নক্ষত্রের নাম। তাঁর নাটক ও কবিতা কেবল ইংরেজি ভাষাকে সমৃদ্ধ করেনি, বরং বিশ্বসাহিত্যের প্রতিটি ধারাকে গভীরভাবে আলোড়িত করেছে। বাংলা সাহিত্যও এর ব্যতিক্রম নয়। ঊনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণ থেকে শুরু করে আধুনিক বাংলা নাটক, অনুবাদ, এমনকি কবিতা, সনেট ও উপন্যাসেও শেক্সপিয়ারের প্রভাব লক্ষণীয়।
এই প্রবন্ধে আমরা পর্যায়ক্রমে আলোচনার চেষ্টা করব
শেক্সপিয়ারের রচনা বাংলা সাহিত্যে প্রবেশের প্রেক্ষাপট, অনুবাদ ও রূপান্তরের ধারা, নাট্যচর্চায় তার প্রভাব, এবং আধুনিক বাংলা সাহিত্য ও সংস্কৃতির ভেতরে তাঁর উত্তরাধিকার।
১, বাংলা সাহিত্যে নবজাগরণ ও শেক্সপিয়ারের প্রভাব:
বাংলা সাহিত্যে শেক্সপিয়ারের প্রবেশের সূত্রপাত ঘটে উনবিংশ শতাব্দীর সূচনালগ্নে, যখন বাঙালি সমাজ পশ্চিমী শিক্ষার সংস্পর্শে আসছে। ইংরেজ শাসনের হাত ধরে কলকাতা শহর হয়ে উঠেছিল উপনিবেশিক আধুনিকতার কেন্দ্র। এখানে ফোর্ট উইলিয়াম কলেজ, হিন্দু কলেজ এবং মিশনারি স্কুলে ইংরেজি সাহিত্যের পাঠ শুরু হয়। সেই সূত্রেই প্রথমবার বাঙালি শিক্ষিত সমাজের হাতে আসে শেক্সপিয়ারের গ্রন্থ।
রাজা রামমোহন রায়, ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূদন দত্তসহ আরো অনেক প্রগতিশীল মনীষীরা পাশ্চাত্য শিক্ষা ও সংস্কৃতির আলোয় আলোকিত হচ্ছিলেন। বিশেষত মাইকেল মধুসূদন দত্তের সাহিত্য-ভাবনা ও নাট্যরীতি গঠনে শেক্সপিয়ারের প্রভাব ছিল গভীর। তিনি ইংরেজি সাহিত্যে পারদর্শী ছিলেন এবং পশ্চিমী রোমান্টিক কাব্যচেতনার পাশাপাশি শেক্সপিয়ারের ট্র্যাজেডি ও হিউম্যানিজমকে গভীরভাবে আত্মস্থ করেছিলেন।
২, অনুবাদ ও রূপান্তরের প্রথম ধারা:
শেক্সপিয়ারকে বাংলায় পরিচিত করার প্রথম বড় পদক্ষেপ ছিল অনুবাদ। ঊনবিংশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকেই তাঁর নাটকগুলির অনুবাদ শুরু হয়।
ইউজিন লাফকাডিও হ্যারিওট এবং কলকাতার ইংরেজি সমাজ শেক্সপিয়ারের নাটক মঞ্চস্থ করত ইউরোপীয় দর্শকের জন্য। কিন্তু দ্রুতই বাঙালি শিক্ষিত সম্প্রদায়ও তাতে অংশ নিতে শুরু করে।
গোবিন্দচন্দ্র দাস, প্যারীচাঁদ মিত্র এবং পরে মাইকেল মধুসূদন দত্ত, তাঁরা ইংরেজি নাট্যরীতিকে বাংলা সাহিত্যে প্রবর্তন করেন। মাইকেল নিজে শেক্সপিয়ারের নাটক সরাসরি অনুবাদ করেননি, কিন্তু তাঁর সরম্য বাণী বা কৃষ্ণকুমারী নাটকে শেক্সপিয়ারীয় ট্র্যাজেডির স্বাদ পাওয়া যায়।
শেক্সপিয়ারের নাটক সরাসরি অনুবাদের প্রয়াস চালিয়েছিলেন হরলাল রায়। উনিশ শতকের শেষভাগে তিনি ম্যাকবেথ এবং হ্যামলেট বাংলায় রূপান্তরিত করেন। যদিও অনুবাদগুলো হুবহু ছিল না, বরং বাংলার সমাজ-সংস্কৃতির সঙ্গে খাপ খাওয়ানোর চেষ্টা করা হয়েছিল।
৩, বাংলা নাট্যচর্চায় উইলিয়াম শেক্সপিয়ার অবদান:
বাংলা নাটকের উন্মেষকালে শেক্সপিয়ার ছিল এক অনিবার্য অনুসরণীয় নাম। শেক্সপিয়ারের নাটকে যেমন মানব-মনস্তত্ত্বের জটিলতা, ভাগ্যের নির্মমতা, এবং নান্দনিক ভাষার দীপ্তি দেখা যায়—বাংলা নাট্যকাররাও সেই সুর অনুসরণ করার চেষ্টা করেছেন।
গিরিশচন্দ্র ঘোষ, বাংলা থিয়েটারের জনক বলা হয় তাঁকে। তিনি সরাসরি শেক্সপিয়ারের নাটক মঞ্চস্থ করেছিলেন। তাঁর মঞ্চে ওথেলো, ম্যাকবেথ, হ্যামলেট বারবার অভিনীত হয়েছে। বাঙালি দর্শক প্রথমবার নাট্যরসের ভিন্ন আঙ্গিকের স্বাদ পান। বহুল প্রসংশিতও হয়।
দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, তাঁর ঐতিহাসিক নাটকগুলিতে (যেমন মেবার পাঠান, শাহজাহান) শেক্সপিয়ারীয় নাট্যরীতির প্রভাব স্পষ্ট। ঐতিহাসিক চরিত্রকে নাট্যরসে রূপায়িত করার ক্ষেত্রে তিনি শেক্সপিয়ারের পথ অনুসরণ করেছিলেন।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যদিও রবীন্দ্রনাথের নাট্যচিন্তা ছিল মৌলিক ও স্বতন্ত্র, তথাপি শেক্সপিয়ারের প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। মানব-মনস্তত্ত্বের গভীর বিশ্লেষণ, সংলাপের নাটকীয়তা এবং চরিত্র নির্মাণে রবীন্দ্রনাথের অনেক নাটকে শেক্সপিয়ারীয় ছোঁয়া রয়েছে।
৪, অনুবাদ ও পাঠকের মধ্যে বিস্তার:
বিশ শতকের প্রথমার্ধে শেক্সপিয়ারের প্রায় সব বিখ্যাত নাটক বাংলায় অনূদিত হয়। হ্যামলেট, ওথেলো, ম্যাকবেথ, কিং লিয়ার প্রতিটি নাটকেরই একাধিক অনুবাদ প্রচলিত ছিল।
সুবোধচন্দ্র মজুমদার ও সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার ছিলেন শেক্সপিয়ারের নাটক অনুবাদের অগ্রদূত।
সেলিম আল দীন এবং মমতাজউদ্দিন আহমদ বাংলাদেশের আধুনিক নাট্যচর্চায় শেক্সপিয়ারের রূপান্তর করেছেন নতুন মাত্রায়। তাঁরা অনুবাদকে সরল পুনর্লিখন হিসেবে না দেখে নতুন সংস্কৃতি-প্রেক্ষাপটে নাটকগুলিকে পুনরায় ব্যাখ্যা করেছেন।
৫, কবিতা ও উপন্যাসে শেক্সপিয়ারের রূপ:
শেক্সপিয়ার শুধু নাট্যকার নন; তিনি ছিলেন এক অমর কাব্যপ্রতিভা। তাঁর সনেটগুলো বিশ্বকাব্যের এক অমূল্য সম্পদ। বাংলা কবিতার ধারা, বিশেষত রবীন্দ্রনাথ থেকে জীবনানন্দ দাশ পর্যন্ত, শেক্সপিয়ারের প্রভাব স্পষ্ট প্রতীয়মান।
রবীন্দ্রনাথের কাব্যে মানবপ্রেম, জীবনদর্শন, এবং নন্দনচেতনা শেক্সপিয়ারের রোমান্টিকতা ও ট্র্যাজেডির সঙ্গে এক অদ্ভুত সাযুজ্য খুঁজে পাওয়া যায়।
জীবনানন্দ দাশের কবিতায় যে গাঢ় বিষণ্ণতা ও ভাগ্যের নির্মমতাবোধ আমরা দেখি, তার সঙ্গে শেক্সপিয়ারীয় ট্র্যাজেডির তুলনা করা যায়।
বাংলা উপন্যাসেও শেক্সপিয়ারের ছায়া রয়েছে। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের চরিত্র নির্মাণ, প্রেম-বিয়োগের কাহিনি কিংবা বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের মানবিক টানাপোড়েন। সব ক্ষেত্রেই শেক্সপিয়ারীয় প্রভাব খুঁজে পাওয়া যায়।
৬, আধুনিক বাংলা থিয়েটার ও শেক্সপিয়ার :
বাংলাদেশে এবং পশ্চিমবঙ্গে আধুনিক নাট্যচর্চায় শেক্সপিয়ারের নাটক মঞ্চস্থ হয় নতুন আঙ্গিকে।
বাংলাদেশের নাট্যদল নাগরিক নাট্য সম্প্রদায় হ্যামলেট ও ম্যাকবেথ মঞ্চস্থ করেছে সমসাময়িক রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে। এতে শেক্সপিয়ারের নাটক নতুন জীবন লাভ করে।
পশ্চিমবঙ্গে বিজন ভট্টাচার্য, বদরুল আনাম সৌদ, ব্রাত্য বসু প্রমুখ নাট্যকার ও পরিচালক শেক্সপিয়ারকে রূপান্তর করেছেন আধুনিক ভাষা ও প্রেক্ষাপটে।
এভাবে শেক্সপিয়ারের নাটক বাংলা সমাজে রাজনৈতিক প্রতীক, সামাজিক প্রতিবাদ এবং শিল্পরসের এক অক্ষয় উৎস হিসেবে টিকে আছে।
৭, শেক্সপিয়ার চিরন্তন মানবিকতার প্রতীক:
শেক্সপিয়ারের নাটকগুলো কেবল রাজা-মহারাজাদের ট্র্যাজেডি নয়, বরং সাধারণ মানবিক দুর্বলতা, ভালোবাসা, লোভ, হিংসা, ক্ষমতালিপ্সা এসব চিরন্তন মানবিক সত্যকে ধারণ করে। এ কারণেই শেক্সপিয়ার আজও আমাদের কাছে প্রাসঙ্গিক। বাংলা সাহিত্যও এই মানবতাবাদের সুরকে গ্রহণ করেছে সানন্দে।
মাইকেল মধুসূদন দত্ত যেমন মানবিক ট্র্যাজেডিকে কাব্যে এনেছিলেন,
রবীন্দ্রনাথ যেমন মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্বকে নাটকে ফুটিয়ে তুলেছিলেন,
কিংবা আধুনিক নাট্যকাররা যেমন শেক্সপিয়ারের ছায়া ব্যবহার করে সমকালীন সমাজকে ব্যাখ্যা করেছেন। সব ক্ষেত্রেই শেক্সপিয়ার এক নিরন্তর উৎস।
৮, সমালোচনা ও সীমাবদ্ধতার প্রসঙ্গ:
তবে সমালোচনার অভাব ছিল না। অনেকে বলেছেন, বাংলা নাট্যকাররা অতিরিক্তভাবে শেক্সপিয়ারের প্রভাব গ্রহণ করেছেন, ফলে মৌলিকতার ঘাটতি দেখা গেছে। প্রাথমিক অনুবাদগুলোও অনেক সময় আক্ষরিক অনুবাদে সীমাবদ্ধ থেকে বাংলার সমাজবাস্তবতাকে উপেক্ষা করেছে। কিন্তু ধীরে ধীরে রূপান্তর ও পুনর্নির্মাণের মাধ্যমে শেক্সপিয়ারের নাটক বাংলা মাটিতে শেকড় গেড়ে বসেছে।
৯, উত্তরাধিকার:
আজকের দিনে যখন বাংলা থিয়েটার নতুন রূপ ও আঙ্গিক খুঁজছে, তখনও শেক্সপিয়ারের উপস্থিতি অটুট। বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর নাটক পড়ানো হয়, থিয়েটারে তাঁর নাটক নতুনভাবে মঞ্চস্থ হয়, এবং সাহিত্য-সমালোচনায় তাঁর নাম উচ্চারিত হয় অবিরত।
শেক্সপিয়ার তাই কেবল একজন ইংরেজ নাট্যকার নন; তিনি এক বৈশ্বিক কণ্ঠস্বর, যিনি বাংলার সাহিত্য ও সংস্কৃতিতেও অমোচনীয় ছাপ রেখে গেছেন।
উইলিয়াম শেক্সপিয়ার বাঙালির সাহিত্যচেতনা ও শিল্পরসকে যেমন সমৃদ্ধ করেছেন, তেমনি আমাদের নাট্য-অভিনয়, কাব্যচর্চা, এমনকি সমাজদর্শনকেও নতুন মাত্রা দিয়েছেন। তিনি দেখিয়েছেন মানুষের অন্তর্দ্বন্দ্ব, প্রেম-বিরহ, লোভ-ঈর্ষা, কিংবা মৃত্যুভয় এসব কোনো ভাষা বা ভূখণ্ডের গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নয়। বাংলা সাহিত্যের দীর্ঘ যাত্রাপথে শেক্সপিয়ার তাই হয়ে উঠেছেন চিরসঙ্গী, এক অমর সাহিত্যালোকবর্তিকা।
প্রাথমিক উৎস( অনুবাদ ও নাটক) :
১, সুবোধচন্দ্র মজুমদার ( ১৯২০-১৯৫০) শেক্সপিয়ার গ্রন্হাবলী ( বাংলা অনুবাদ), কলকাতা: বিশ্বভারতী।
২, সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার (১৯২৫) “হ্যামলেট, ওথেলো, ম্যাকবেথ ( বাংলা অনুবাদ) ” কলকাতা : ভারতী প্রেস।
৩,হরলাল রায় ( ১৮৯৪) “হ্যামলেট “( অনুবাদ), কলকাতা।
৪, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় (১৯১৪), ‘মেবার পাঠান’ কলকাতা: মহারাজা লাইব্রেরি।
৫, দ্বিজেন্দ্রলাল রায় “(১৯১৫) শাহজাহান “কলকাতা।
৬, গিরিশচন্দ্র ঘোষ,” বাংলা নাটকের সংকলন” কলকাতা: বাংলা থিয়েটার।
৭, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ( বিভিন্ন সংস্করণ) “রক্তকরবী, রাজা, চিত্রাঙ্গদা, “কলকাতা বিশ্বভারতী।
৮, সেলিম আল-দীন ( ১৯৮০)” জন্ডিস ও বিবিধ বেলুন” ঢাকা: বাংলাদেশ নাট্যকেন্দ্র।
৯, মমতাজউদ্দিন আহমদ (১৯৯৫) ” বাংলা নাটক ও শেক্সপিয়ার রূপান্তর” ঢাকা বাংলা একাডেমি।
গবেষণা ও সমালোচনা :
১০, লেখিকা সেলিনা হোসেন (১৯৮৮) বাংলা সাহিত্যে পাশ্চাত্যের প্রভাব। ঢাকা: বাংলা একাডেমি।
১১, অশোক মিত্র (১৯৬২) “বাংলা নাটকের ইতিহাস ” কলকাতা, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়। (১৯৬২)।
১২, সুশীলকুৃমার দে( ১৯১৯) ” History of Bengali Literature ” কলকাতা, কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস।
১৩, বাংলা একাডেমি (২০০৫),” বাংলা নাটকের ইতিহাস ” ঢাকা: বাংলা একাডেমি।
১৪, দেশ পত্রিকা (১৯৯০) ” বাংলা নাটক ও শেক্সপিয়ারের প্রভাব “কলকাতা: দেশ, সংখ্যা।
সোমা ঘোষ মণিকা